| ইসরায়েলে নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বুথফেরত জরিপগুলো নেতানিয়াহুর দলের গত নির্বাচনের চেয়ে খারাপ ফলাফলের আভাস দিচ্ছে। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে নতুন সরকার গঠন করতে তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, নেতানিয়াহুর সমর্থনের তিনটি প্রধান ভিত্তি রয়েছে—অতি-রক্ষণশীল ইহুদি গোষ্ঠী, কট্টর ডানপন্থিরা এবং তার ব্যক্তিগত সমর্থকেরা। অতি-রক্ষণশীলদের একটি অংশ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর সরকারের সময়ে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের মতো ডানপন্থিদের লক্ষ্যও এগিয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা: বিরোধী নেতা রাহাতের মতে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা সব সময় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে না। নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা মনে করেন, দেশটির প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো তার বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং ৭ অক্টোবরের হামলার ব্যর্থতার জন্য এককভাবে তাকে দায়ী করা যায় না।
খুব শিগগির ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে উঠবে: ট্রাম্প তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের গত চার বছরের নীতি নিয়ে অসন্তোষও বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগকে অনেকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। সেনাবাহিনীতে অতি-রক্ষণশীলদের নিয়োগের বিষয়েও অগ্রগতি না থাকায় সমালোচনা রয়েছে। পাশাপাশি কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের রাজনৈতিক অবস্থানও বিতর্ক তৈরি করেছে।
এ ছাড়া, গাজায় যুদ্ধ ও পশ্চিমতীরে অবৈধ বসতি স্থাপন ঘিরে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে ইসরায়েল। এক সময়ের ইউরোপীয় বন্ধুরা তার নীতির সমালোচনা করে বিরুদ্ধে চলে গেছেন। ইসরায়েলকে বিশ্বে ক্রমশই একা করে ফেলেছেন নেতানিয়াহু। বিষয়টি কয়েকবার উঠে এসেছে প্রিয় বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেও। হারলে জেলে যেতে হতে পারে এমন শঙ্কায় বারবার পেছানোর পর অবশেষে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছেন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবারের নির্বাচন শেষে ভোট গণনায় বুথ জরিপ সেই শঙ্কাকে শক্তিশালী করছে।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের নির্বাচনি ড্যাশবোর্ডে দেখা যাচ্ছে, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় ছিল সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে আংশিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৯টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। তবে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে বর্তমান ফলাফলে দলটির এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য ভোট গণনা এখনো শেষ হয়নি। লিকুদ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও অন্য ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করতে পারেন।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে সমস্যাগুলো আরও গভীর হতে পারে বলে অনেক ইসরায়েলি আশঙ্কা করছেন। তার ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে ইসরায়েল ছাড়ার কথাও ভাবছেন।
তবে এর আগেও একাধিকবার রাজনৈতিক সংকটে পড়েও ক্ষমতায় ফিরেছেন নেতানিয়াহু। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকার তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার কারণে দেশটিতে চারবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এবার তার সামনে দুর্নীতির বিচারসহ বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে সমালোচনা তার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ট্রাম্পের সমর্থন তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বরং কমেছে।
একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর চেয়ে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এগিয়ে ছিলেন। আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ, আর নেতানিয়াহুর পক্ষে ৩৩ শতাংশ। জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়, যেখানে বিদায়ী সংসদে দলটির আসন ছিল ৩২টি। আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন পেতে পারে বলেও জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর সমর্থন কমলেও বিরোধী দলগুলো জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারেনি। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে সরকারের ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরোধীদের ভূমিকা দুর্বল ছিল।
চূড়ান্ত জরিপগুলোতে কোনো দল বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। বিশ্লেষকেরা তাই নির্বাচনের ফল নিয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দিতে রাজি নন। তাদের আলোচনায় নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বড় দুই দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন কিংবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
|