পুরো পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও এখন বুঁদ হয়ে আছে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায়। এ উন্মাদনায় ট্রলের শিকার হয়ে, বিশেষ করে ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে দেশে।
উদ্বেগজনক এ বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয়েছে আলোচিত ইসলামী বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহকে। সেখানে বলা হয়, ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনায় এ বছর ১০ থেকে ১২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় একজন আত্মহত্যা করেছেন প্রতিপক্ষের ট্রোলিং বা বোলিংয়ের কারণে। এসব মৃত্যুর জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী?
নিজের ইউটিউব চ্যানেলের ওই লাইভ অনুষ্ঠানে সেই প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক একটা বাস্তবতা যে, আমাদের দেশে প্রতিবছরই খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ ঝরে। একজন ইমানদারের জীবন এতটা সস্তা হয়ে গেল কীভাবে যে কোথাকার কোন দেশের খেলোয়াড়রা হারলো নাকি জিতলো, তার জন্য আমরা নিজেরা মারামারিতে লিপ্ত হয়ে যাব, এমনকি খুন পর্যন্ত করে ফেলব! এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলেছে। এই উন্মাদনা যারা তৈরি করছেন এবং এই উন্মাদনাকে যারা মাত্রাহীনভাবে সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
খেলাধুলা মানুষের জীবনের অংশ হতে পারে, বিনোদনও জীবনের অংশ হতে পারে; শরীয়তের সীমানার মধ্যে থেকে সেটা করতে শরিয়ত নিষেধ করে না। কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলার বেঁধে দেওয়া সীমানা ক্রস করে গেলে সেখানে আজ হোক বা কাল অকল্যাণ আসবেই। মানুষ একটা সময় হয়তো এটা বুঝবে, কিন্তু ততদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কুষ্টিয়ায় বিশেষ করে যে ঘটনা ঘটেছে, গণমাধ্যম থেকে যেটুকু জানা গেল তা হলো, ওই ব্যক্তির পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় তিনি মন খারাপ করেছিলেন। এর মধ্যে তার প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের অতিমাত্রার বুলিং বা ট্রোলিং তিনি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ তার স্ত্রী আছেন, ছোট ছোট সম্ভবত দুইটা বাচ্চাও আছে। এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়?
এর চেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কী হতে পারে যে, একটা দেশে ১০-১২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে এমন একটা খেলা নিয়ে, যে খেলায় সেই দেশের কোনো অংশগ্রহণই নেই। কোথাকার কোন দেশের খেলা, আর আমরা এমন সব দেশকে সাপোর্ট করছি যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে রীতিমত ঘোষণা দিচ্ছে যে তারা ইহুদিবাদীদের সাথে আছে, ফিলিস্তিনের বিপরীতে অবস্থান করছে এবং তাদের সমর্থকরা গ্যালারিতে ইজরাইলের পতাকার প্রদর্শন করছে। আর মুসলমানের সন্তান তাদের জন্য এমন পাগলপারা হয়ে যাচ্ছে যে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে! এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় আর কী হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই ভাইদেরকে হেদায়েত দান করুন, আমীন।
আপনাদের যাদের সুযোগ আছে, তারা সুস্থ থাকার জন্য শারীরিক কসরত করবেন, ব্যায়াম করবেন—শরীর সুস্থ রাখার জন্য এটি খুবই দরকার। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, দুর্বল ইমানদারের চাইতে আল্লাহ তাআলার কাছে সবল ইমানদার বেশি প্রিয়। আর সবল ইমানদার থাকার জন্য আপনার খাদ্য, আপনার ঘুম এবং আপনার সবকিছু পরিমিত হওয়া দরকার, স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া দরকার এবং হিসেব-নিকেশ করে হওয়া দরকার। খাদ্যের পুষ্টিগুণ বা ফুড ভ্যালু বিবেচনা করে আমাদের খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা শরীরের জন্য উপকারী।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল ও তায়্যিব খাবার খেতে বলেছেন। এখানে তায়্যিব শব্দের আক্ষরিক অর্থ পবিত্র হলেও তাফসিরের ইমামগণ এর কয়েক ধরনের ব্যাখ্যা করেছেন। তার মধ্যে একটি ব্যাখ্যা হলো, যে খাবার মানুষের দুনিয়া এবং আখেরাতে কোনো ক্ষতির কারণ হবে না, সেটাই তায়্যিব। ইমাম ইবনে আশুর রহিমাহুল্লাহ তার তাফসিরে একই কথা লিখেছেন যে, তায়্যিব মানে হলো যে খাবারে মানুষের দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হবে না এবং আখেরাতেও ক্ষতির কারণ হবে না।
জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত তেলজাতীয় বা তেলে ভাজা অস্বাস্থ্যকর খাবার যা আপনার স্বাস্থ্য নষ্ট করবে, এসিডিটি তৈরি করবে এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর হবে—এ রকম খাবার খেতে কিন্তু ইমানদারকে আল্লাহ উৎসাহিত করেন নাই। একজন ইমানদারের উচিত সবসময় সুস্থ থাকার চেষ্টা করা এবং তার লাইফস্টাইলকে সেভাবেই সাজানো। পুরোপুরি অর্গানিক খাবার না পেলেও অন্তত প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা এবং আর্টিফিশিয়াল, প্রসেসড কিংবা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা।
সুস্থ থাকতে হবে কারণ আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, এমন কি প্রয়োজন হলে জিহাদ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। মুমিন সুস্থ থাকার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করবে এবং শরিয়তের সীমানার মধ্যে থেকে খেলাধুলাও করবে, কিন্তু এভাবে খেলার উন্মাদনায় মত্ত হওয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না। যে উন্মাদনার কারণে আমরা ১০-১২ টা মানুষের জীবন হারালাম।
যে পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের হারিয়েছে, কেবল তারাই এই কষ্টের গভীরতা জানে। এই উন্মাদনাকে যারা লাগামহীনভাবে সৃষ্টি করেছে, আমার মনে হয় তাদের উচিত এটার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং এই লাগামহীন উন্মাদনাকে কোনোভাবেই এপ্রিশিয়েট বা প্রশ্রয় না দেওয়া।
আমি আবারও বলছি, ইসলাম বিনোদনকে নিরুৎসাহিত বা নিষেধ করে না, কিন্তু প্রত্যেকটা জিনিসের একটা সুনির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। যে কাজের পেছনে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো লাভ নেই, এমন অনর্থকতা ইসলাম সমর্থন করে না। আপনি খেলাধুলা করলে শরীরে ব্যায়াম হবে, ঘাম ঝরবে এবং সুস্থ থাকবেন—সেটি আপনি করুন। কোনো কিছু যদি আপনার আনন্দের কারণ হয় এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে, তবে তা করতে পারেন, কিন্তু সীমার বাইরে গিয়ে নয়। আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।
যারা খেলার নামে এই উন্মাদনার মধ্যে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এর পেছনের অনাচারগুলো খেয়াল করছেন না, তাদের উচিত এই উন্মাদনা অনতিবিলম্বে পরিহার করা। একজন মুসলমানের ইসলাম তখন সুন্দর হবে, যখন সে অহেতুক ও অনর্থক কাজ পরিহার করবে।