রাজধানীর উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। গত বছরের এই দিনে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ ৩৬ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল শিক্ষার্থী।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের বিভীষিকা আজও তাড়া করে ফেরে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া খুদে শিক্ষার্থীদের। আকাশে বিমান উড়ার শব্দ শুনলেই আঁতকে ওঠে কেউ, আবার আগুনের দৃশ্য দেখলেই ফিরে আসে সেই ভয়াবহ দুপুরের স্মৃতি। স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবারগুলোও। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না হওয়ার ক্ষোভ।
কী ঘটেছিল সেদিন
২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার। দুপুর প্রায় ১টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই পুরো এলাকা পরিণত হয় বিভীষিকার জনপদে।
দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় শিশুদের কোমল শরীর। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
কেমন আছেন ক্ষতিগ্রস্তরা
সময়ের সঙ্গে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকতা কিছুটা ফিরেছে। শিক্ষার্থীরা আবার ক্লাসে ফিরেছে, চলছে নিয়মিত পাঠদান। কিন্তু ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় দুপুর আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে অনেকের মনে। মাঝেমধ্যেই আকাশে বিমানের শব্দে আঁতকে ওঠেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অনেকের চোখ ভিজে ওঠে অজান্তেই।
সন্তান হারানো পরিবারগুলোর শোকও এক বছরেও কাটেনি। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ হয়নি। ফলে বিচার ও জবাবদিহি নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
দুর্ঘটনায় নাফি ও নাজিয়া নামে দুই সন্তানকে হারিয়ে নিঃসন্তান হয়ে পড়া আশরাফুল বলেন, এক বছর পরও তিনি ও তার পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সন্তানদের স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। সরকারের কাছে তার একমাত্র প্রত্যাশা—হারানো সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রথমদিকে বিভিন্ন মহল থেকে খোঁজখবর নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে তা কমে গেছে। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এমনকি দুর্ঘটনায় নিহত স্কুলকর্মী মাসুমা বেগমের পরিবারও প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি বলে দাবি করেছেন তার স্বামী।
এদিকে, যে ভবনটিতে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে ভবনটি নতুন রূপ পেলেও স্বজন, সহপাঠী ও সহকর্মী হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি কত দিনে মুছে যাবে-সে প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
দুই দিনব্যাপী স্মরণ কর্মসূচি
ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ। সোমবার (২০ জুলাই) মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা নিহতদের স্মরণ এবং আহতদের জন্য দোয়া করেন।
মাইলস্টোন স্কুলের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর জানান, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুর্ঘটনাস্থল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করবেন। নিহতদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে, পালন করা হবে এক মিনিট নীরবতা। দোয়া ও স্মৃতিচারণার পাশাপাশি নিহতদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা এবং বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন করা হবে। এ আয়োজনে অভিভাবকরাও অংশ নেবেন।