রাজনীতিতে ব্যক্তিস্বার্থ, পারস্পরিক রেষারেষি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল পরিহার করে দলের আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, নৈরাজ্য ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, কতিপয় সুবিধাবাদীর অপকর্মের দায় দল বা সরকার নেবে না।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে খুলনা প্রেসক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। তবে সেই প্রতিযোগিতা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আক্রোশ, শত্রুতা কিংবা বিভেদে রূপ নেওয়া উচিত নয়। দলের ভেতরে অনৈক্য তৈরি হলে ফ্যাসিবাদের দোসর ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল সুযোগ নেবে। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।
নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘পকেটের লোক’, ‘ভাইয়ের লোক’ কিংবা ‘মাই ম্যান’ সংস্কৃতির দিন শেষ। সারাদিন দলীয় কার্যালয়ে সময় কাটানো কিংবা মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেওয়াই মনোনয়নের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হবে না।
তিনি বলেন, সাধারণ ভোটারের কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি এবং নির্বাচনের মাঠে যিনি জয়ী হওয়ার সক্ষমতা রাখেন, দল তাকেই মনোনয়ন দেবে। তৃণমূল নেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য ও ‘উইনিং ক্যান্ডিডেট’ বাছাই করে কেন্দ্রে প্রস্তাব পাঠাতে হবে।
বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ধর্ষণ ও স্পষ্ট দুর্নীতির মামলা ছাড়া রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কাজ করছে।
খুলনার রাজনৈতিক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এ কাজে কোনো পাবলিক প্রসিকিউটরের গাফিলতি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রূপসা ঘাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে কৃষকদের পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত টোল আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ কৃষকদের জিম্মি করতে কিংবা ঘাট-বাজারে চাঁদাবাজি করতে পারবে না। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো বড় নেতা এসব অপরাধীর পক্ষে তদবির করলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজদের দায় দল কিংবা সরকার নেবে না।
সরকারের বিভিন্ন সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ভিআইপি প্রটোকল সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ প্রটোকল কমিয়ে জনগণের নিরাপত্তায় পুলিশকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীদের গাড়ির বহর কমানো এবং জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমিয়ে রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই প্রায় ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে চার কোটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল এমপি, আমির এজাজ খান এমপি, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন, কেডিএস’র নব নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোল্লা খায়রুল ইসলাম, মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সাদী, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম কবীর, মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ বাবু প্রমুখ।
মতবিনিময় সভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব (ভারপ্রাপ্ত) ও খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পী।