‘রেখো মাটির পরে দুটি পা, রেখো মাটির সাথে দোস্তি; জেনো আকাশের কোনো ঠিক নেই, মাটি মরণেও দেয় স্বস্তি’—সুরে সুরে কথাগুলো বলেছেন সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান। কিন্তু এ ভূমিকার অবতারণা সায়ান কিংবা তার গানের জন্য নয়; বরং অভিনেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশীর জন্য। যোগ-বিয়োগের মতো অংক না মিলিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে গল্পের ঘরে ঢুকে পড়া যাক।
ঘরে পর্যাপ্ত আলো। নীল রঙা একটি মোড়া। তার উপর বসে ফর্সা বাদামি রঙের এক তরুণী। পরনে তার লাল টপ, কালো প্যান্ট আর ধূসর রঙের অ্যাপ্রোন। তার সামনে ঘূর্ণায়মান এক চাকতি, সেটার উপর কাদামাটি। মাটি ঘুরছে চাকতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সেই তাল কিছুটা কাটিয়ে মাটিকে ভিন্ন আদল দেয়ার চেষ্টা করছেন তরুণী। একবাক্যে বললে, মৃৎশিল্পের হাতেখড়ি নিচ্ছেন তিনি।
ছবি দেখে তো বোঝার বাকি নেই, সেই তরুণীর নাম ঐশী। গল্পের মতো সুন্দর—মননে ও বদনে। করেন অভিনয়। কিন্তু হঠাৎ কুমোর হওয়ার শখ জাগল কেন?
গল্পের ভেতর থেকে বের হয়ে এবার সরব বাস্তবের ঐশী। নরম, তবু উচ্ছ্বাসে ভরা স্বরে বললেন, ‘গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমার। ফলে কিছুদিন পরপরই শহুরে পরিবেশে একটু হাঁসফাঁস লাগে। একটু ঘাস, মাটির সংস্পর্শে আসতে ইচ্ছে করে। তাছাড়া দিন কয়েক আগে একটু অসুস্থও ছিলাম। সে জায়গা থেকেও মনে হচ্ছিল, মাটি-ঘাসের কাছে গেলে ভালো লাগবে। আর এই কাদামাটি দিয়ে জিনিসপত্র বানানো; মানে হুইল ঘুরিয়ে মাটিকে নানা আকৃতি দেয়ার যে শিল্প, সেটার প্রতি আমার আগ্রহ অনেক আগের। কিন্তু কখনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সম্প্রতি বিষয়টা আমার বন্ধুকে জানাই; ও থিয়েটার করে, প্রপসের জন্য প্রায়ই মাটি নিয়ে কাজ করতে হয়। তবে এরকম হুইল ঘুরিয়ে সেও কখনো কিছু করেনি। ফলে, দুজনেরই আগ্রহ হলো।’
তারপর মাটি-চাকতির বন্দোবস্ত হলো কিভাবে? না, জগত-সংসার ঘুরে সেটা ঘরে নিয়ে আসতে হয়নি। রাজধানীতে কিছু ক্লে-স্টেশন গড়ে উঠেছে। সেগুলোর সন্ধান করেই একটাতে গিয়ে হাজির হলেন তারা। অতঃপর কাদামাটির সঙ্গে পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নেওয়া।
কাজটা কেমন? সহজ? চাকা ঘুরল, তাতে মাটি দিয়ে শুধু হাত ধরলেই হয়ে যায়? একদমই তা নয়। শিল্প বলে কথা, চেষ্টা, সাধনা আর ইচ্ছে সবকিছুই দিতে হয় তাকে। ঐশীর ভাষ্য, ‘বড় হুইল দিয়ে চেষ্টার আগে ছোটটা দিয়ে ট্রাই করলাম। আর বুঝলাম, ইটস রিয়েলি ডিফিকাল্ট। যারা কুমোর, উনাদের শিল্প, দক্ষতা, পরিশ্রমের প্রতি সম্মান অনেক বেড়ে গেল।’
প্রথমবার শখের কুমোর সাজা। কিছু বানানো গেল কি? ‘এ কাজে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, মাটির দলাটাকে চাকতির ঠিক মাঝখানে রাখা। তারপর সেটাকে ঘুরিয়ে কোনো কিছুর আকৃতি দেয়া, খুব কঠিন। একরকম আকৃতি যে দিতে পেরেছি, তা-ই বিরাট ব্যাপার। সেটাকে পুড়িয়ে বাসায় নিয়ে আসব, তার জন্য আরও অনুশীলন লাগবে’—ঐশীর জবাব।