বাংলাদেশকে ‘ওভার-রেগুলেটেড’ দেশ উল্লেখ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমাতে ডি-রেগুলেশন কার্যক্রম জোরদারের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাধা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ‘দরজা দেখিয়ে দেওয়া হবে’। এ লক্ষ্যে অভিযোগ গ্রহণে একটি বিশেষ ওয়েবসাইট ও টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে।
রোববার (২১ জুন) দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাজেট সংলাপ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইজ ওভার-রেগুলেটেড কান্ট্রি। যেখানে ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে পারে না, সাধারণ মানুষের জীবনও অনেক কঠিন হয়ে যায়। আমরা ডি-রেগুলেশন চাই। এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি ওয়েবসাইট চালু করা হবে, যেখানে ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ ডি-রেগুলেশন বাস্তবায়নে কোনো বাধা বা নিয়মের অপব্যবহার দেখতে পেলে তা জানাতে পারবেন। টাস্কফোর্স এসব অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের বার্তা খুব পরিষ্কার। ডি-রেগুলেশন ও ব্যবসার পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে খুঁজে বের করা হবে। যারা উন্নয়ন ও ব্যবসার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের আমরা দরজা দেখিয়ে দেবো। দেশের জন্য কাজ না করলে তাদের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের প্রতি আমাদের জবাবদিহি রয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসন ও অর্থনৈতিক সংকটের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। শতভাগ সফল না হলেও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
এসময় অর্থমন্ত্রী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এ তিন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর সুফল দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছে।
বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিপুল পরিমাণ বকেয়া দায় ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বিল বকেয়া ছিল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট ও অর্থায়নের চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে শুধু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজতে হবে। এজন্য বাজারভিত্তিক অর্থায়ন, বন্ড ইস্যুসহ বিভিন্ন পদ্ধতি বিবেচনা করছে সরকার।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় নতুন বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান, ডি-রেগুলেশন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মানুষ এখন বাজেটের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
আলোচনায় বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে তৈরি পোশাক খাত ও রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের পথে দুর্নীতি, বাস্তবায়ন ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অপচয় বড় বাধা। তিনি প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, তিন ধরনের কঠিন রোগ বাজেট বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যার একটি হচ্ছে দুর্নীতি, অন্যটি বাস্তবায়ন ব্যর্থতা। এটি দুর্নীতির মতই বড় সমস্যা। অন্য রোগটি হলো যেটিকে আমি বলি ইনস্টিটিউশনাল ওয়েস্ট।
সংলাপে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ অর্থনীতি, ব্যবসা ও শ্রম খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।