চলতি বছরে তৃতীয়বারের মতো তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে পশ্চিম ইউরোপ। তীব্র গরমে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আগামী সপ্তাহের আগে তাপমাত্রা কমার কোনো লক্ষণ নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা। তীব্র গরমের কারণে ফ্রান্সের ৯৬টি অঞ্চলের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির সরকার।
ফ্রান্সের বিশাল অংশজুড়ে তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। দেশটিতে এখন চলছে ‘ক্রান্তীয় রাত’। অর্থাৎ রাতের বেলাও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না। তীব্র গরমে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে গাড়ির ভেতর আটকে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বোর্দোর কাছে প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন তিন প্রবীণ নাগরিক।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরও ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের একাংশের জন্য চরম তাপপ্রবাহের রেড ওয়ার্নিং জারি করেছে। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গরমের অনুভূতি আরও বেশি হচ্ছে।
এদিকে জার্মানিতে তাপমাত্রা বাড়ায় বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বন, স্টুটগার্ট ও ফ্রাঙ্কফুর্টের মতো শহরগুলোতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
দায়ী কি এল নিনো?
ইউরোপের এই তীব্র গরমের পেছনে অনেকেই জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’কে দায়ী করছেন। সম্প্রতি মার্কিন আবহাওয়া দপ্তর প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গণমাধ্যমে এটিকে ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তবে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের বর্তমান গরমের জন্য শুধু এল নিনোকে দায়ী করা ভুল হবে।
গ্লোবাল আবহাওয়া পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্ম ডব্লিউওয়াইএফ২৪–এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়োয়ানা ভার্জিনি বলেন, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি নেই। আর এল নিনো থাকলেও ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের ওপর এর সরাসরি প্রভাব খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, এটি মূলত জেট স্ট্রিমের বাধাপ্রাপ্ত প্রবাহের কারণে তৈরি হওয়া একটি তাপগম্বুজ (হিট ডোম) পরিস্থিতি। দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এই তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করেছে। এখানে এল নিনোকে দায়ী করা বিভ্রান্তিকর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর মূল প্রভাব মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চলে পড়ে। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকায় বন্যা এবং অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে এর প্রভাব পড়ে অনেক পরে, সাধারণত শরতের শেষে বা শীতের শুরুতে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা আসে এবং যায়। কিন্তু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। বিশ্ব গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে ইউরোপ। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না করলে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
সূত্র: ইউরো নিউজ