টানা ১০ দিনের বৃষ্টিতে ভোলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে তলিয়ে ও ভেসে গেছে আমনের বীজতলা ও চারা। এতে চলতি মৌসুমে আমন আবাদ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, আর ধার-দেনা করে বীজতলা প্রস্তুত করা হাজারো কৃষক পড়েছেন চরম আর্থিক সংকটে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, মাঠে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তেমন কোনো তৎপরতা বা খোঁজখবর তারা পাননি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোলার বিভিন্ন মাঠে কৃষকদের যত্নে লালিত আমনের বীজতলা ও চারা এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। চারদিকে শুধু থইথই পানি। অনেক কৃষক পানিতে নেমে ভালো চারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু হাত বাড়ালেই মিলছে পচে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া চারা। গত ১০ দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলার শত শত হেক্টর জমির আমনের বীজতলা ও চারা ভেসে গেছে। এতে মাথায় হাত পড়েছে হাজার হাজার কৃষকের। আর কয়েক দিনের মধ্যেই এসব চারা তুলে জমিতে রোপণের কথা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টির পানিতে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে আমনের চারার সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত চারা না পাওয়ায় জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যেতে পারে।
ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ভোলার সাত উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা হয়েছে। এদের মধ্যে পানিতে প্লাবিত হয়েছে ২২৫ হেক্টর বীজতলা ও চারা। এছাড়াও চলতি বছর আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ হেক্টর।
ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাছির মাঝি গ্রামের কৃষক মো. জসিম উদ্দিন জানান, তিনি প্রতি বছরের মতো এবছরও নিজের ও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আমন আবাদ করবেন। এজন্য কয়েকদিন আগে ৪০ শতাংশ জমিতে আমনের বীজতলা করেছেন। সব মিলে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। চারাও বড় হয়েছিল। কয়েকদিন পর ওই চারা তুলে মাঠে আবাদ করবেন। কিন্তু গত ১০ দিনের টানা বৃষ্টিতে তার ক্ষেতে পানি জমে ডুবে গেছে চারা। ৪/৫ দিন ধরে ডুবন্ত অবস্থায় থাকায় সব পচে যাবে। এখন পানি কমলে আবারও নতুন করে বীজতলা তৈরি করে তারপর আমন আবাদ করতে হবে। এতে তার দ্বিগুণ খরচ গুনতে হবে।
ভেদুরিয়া ইউনিয়নের চর চটকি মারা গ্রামের কৃষক মো. শাজাহান মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে বীজতলা করেছেন। টানা কৃষ্টিতে তার বীজতলা ভেসে গেছে। বীজতলা করতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে এবং যে পরিশ্রম হয়েছে সব পানিতে চলে গেছে।
দক্ষিণ দিঘলদী গ্রামের কৃষক মো. শামিম ও হারুন জানান, আমন চাষে তাদের কৃষকদের লাভ বেশি হয়। একারণে তারা প্রতি বছর আমন চাষ ঝুঁকেন। কিন্তু এবার বৃষ্টিতে যেভাবে বীজতলা নষ্ট হয়েছে তাকে এবছর চারা সংকটে পড়তে হবে তাদের।
ধনিয়া ইউনিয়নের নাছির মাঝি গ্রামের আরেক কৃষক মো. ফারুক জানান, তিনি কৃষি কাজে নির্ভর। কৃষি কাজ করেই তার সংসার পরিচালিত হয়। চলতি বছর ধার-দেনা করে ৫০ কেজি ধানের বীজতলা করেছেন। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে তার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আবারও নতুন করে বীজতলা করতে হলেও আবারও ৩০/৪০ হাজার টাকা খরচ হবে। নতুন করে আবারও দেনায় জড়িয়ে পড়তে হবে তার।
কৃষক মো. মানিক মিয়া ও মো. রাসেল জানান, তারা কৃষকরা টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পরলেও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের কোনো খোঁজ-খবর ও মাঠ দেখতে যাননি।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালন মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রণোদনা দেওয়া হবে।
এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, তারা মাঠে যাচ্ছে। তাদের মাধ্যমেই আমরা ক্ষয়-ক্ষতি বিষয়ে জেনেছি। তবে জনবল সংকটের রয়েছে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গেলে যাদের সঙ্গে দেখা হয়নি তারাই এমন অভিযোগ করেন।