কুড়িগ্রামে এখন মাঠজুড়ে সবজির সমারোহ। কোথাও কোথাও সবুজ সবজিতে চারপাশ সবুজ চাদরে ঢাকা পড়েছে, কোথাও চাষাবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক। এর মাঝেও বাতাসে দোল খাওয়া লতানো সবজির দৃশ্য কৃষকের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। তবে আগাম সবজি চাষে সার ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধিতে দিশাহারা কৃষক। মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সঠিক তদারকি দরকার বলে জানিয়েছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এর বাইরে সাড়ে ৭০০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠে বীজ রোপণ ও চারা লাগানোয় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এর মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, বরবটি, গাজর, টমেটো, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে লাভবান হতে চান তারা। তবে হঠাৎ করেই সার সংকট ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধিতে হতাশ কৃষকরা।
জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরেরবাড়ি গ্রামে আগাম ফুলকপির বীজ রোপণ করছেন বেশ কয়েকজন চাষি। খেদাবাগ গ্রামের বাচ্চা মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলাম ৪ শতক জমিতে বীজ রোপণ করছিলেন।
তিনি জানান, মৌসুম এলেই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সংকট দেখিয়ে বীজ, সার ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি করে। গতবার যে ফুলকপির এক প্যাকেট বীজ কিনেছিলেন এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায়, এবার সেই বীজ কিনতে হয়েছে ১৭০০ টাকায়।
একই গ্রামের খবির উদ্দিনের ছেলে কামাল ও গোলজার খন্দকারের ছেলে রাকিব খন্দকার জানান, সব কিছুরই মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, ফলে সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা। বাঁশের দাম বেড়েছে, মজুরির দাম বেড়েছে, পলিথিনের দাম বেড়েছে, ডিজেল-পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধিতে সেচেও বেশি খরচ হচ্ছে। তারপরও কৃষক আগাম সবজি চাষ করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
খেদাবাগ গ্রামের বর্গাচাষি মনিরুজ্জামানের ছেলে মোকছেদুল জানান, এক প্যাকেট ফুলকপির বীজে খরচ ৬০০ টাকা, চারা হয় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টি। বীজ থেকে ২৫-৩০ দিনে চারা হয়। এই চারা ৬০ দিন পর উত্তোলন পর্যায়ে চলে যাবে। সবমিলিয়ে ৯০ দিন পর সবজি ঘরে তোলা যাবে।
একই গ্রামের মৃত আব্দুস ছামাদের ছেলে গোলজার খন্দকার জানান, এই মীরেরবাড়ি গ্রামটিতে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়। সবজিই এখানকার কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল। এক একর থেকে ৪-৫ একর জমিতে চাষিরা আগাম সবজি চাষ করবেন। তবে বড় সমস্যা হলো, চাইলেই সার পাওয়া যায় না। ডিলাররা বলেন সার নেই। বাধ্য হয়ে খোলাবাজারে অধিক মূল্যে সার কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়াও আগাম সবজি চাষে অধিক হারে কীটনাশকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে কীটনাশকের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিষয়গুলো সরকারের তদারকি করা দরকার।
খেদাবাগ বাজারের ডিলারের দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সাবেক ডিলার ঈসমাইল হোসেন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী নাজমিন নাহারের নামে ডিলারশিপ করা আছে। এখন তাদের ছেলে রাসেল সেটি দেখভাল করেন।
রাসেলের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তাদের কাছে টিএসপি ৪৬ বস্তা, ২৯ বস্তা ডিএপি ও ১২৭ বস্তা পটাশ মজুত আছে। কৃষকদের চাইলে সার দেওয়া হয় না কেন- এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর তারা দিতে পারেননি। সরবরাহ না থাকায় কৃষকদের প্রয়োজনমতো সার দিতে পারছেন না বলেও স্বীকার করেন তিনি।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনো বক্তব্য না দিলেও রাজারহাট উপজেলা কৃষি অফিসের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী জানান, সবজি চাষ করে এখানকার চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সবজি বিক্রি করে তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জেলায় কোনো সারের সংকট নেই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। আশা করা যায়, এখন কোথাও কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তারপরও কারও কোনো সমস্যা হলে নিকটস্থ কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলেই তারা সঠিক সমাধান পাবেন।