আরব সাগরে ভারত আর পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জাহাজে সংঘর্ষের পরে দুই দেশই অপরের শীর্ষ কূটনীতিককে ডেকে পাঠিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আর্ন্তজাতিক সমুদ্রসীমা পাহারা দেওয়ার সময় ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে দাবি করে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে কোথায়, কী ধরনের জাহাজের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়েছে তা তাদের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট নয়।
এই ঘটনার পর ভারত দিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের সর্বোচ্চ কূটনীতিবিদকে তলব করে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তারাও এই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের শীর্ষ কূটনীতিবিদকে ডেকে পাঠায়।
গত বছর পেহেলগামের ঘটনার পর দুই দেশেই বর্তমানে কোনো রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত নেই। তার বদলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রয়েছেন, যাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে উভয় দেশের পক্ষ থেকেই।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তান নৌবাহিনীর সি স্পার্ক ২৬ মহড়া চলাকালে একটি ভারতীয় জাহাজ পাকিস্তানি একটি জাহাজের অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে এবং আক্রমণাত্মকভাবে অগ্রসর হয়, যার ফলে জাহাজ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে।
এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ঘটনাটি ঠিক কোথায় ঘটেছে এবং কী ধরনের জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে তারা বলেছে, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে। ঘটনাটি ১৯৯১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির ১০ নম্বর ধারার সরাসরি লঙ্ঘন বলেও অভিযোগ করেছে তারা।
• ভারত ও পাকিস্তানের কী অভিযোগ?
বুধবার এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পাকিস্তানি হাই কমিশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকতাকে দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর ইউনিটের অগ্রহণযোগ্য ও অপেশাদার আচরণের কারণে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি ইউনিটের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটে। এই ঘটনায় পাকিস্তানি কূটনীতিকদের কাছে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটা এই ঘটনায় বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, পাকিস্তানি নৌ-জাহাজের আচরণ ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৯১ সালের এপ্রিলে স্বাক্ষরিত সামরিক মহড়া, কৌশলগত অনুশীলন ও সৈন্য চলাচলের আগাম বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত চুক্তির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে যেন তিনি সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে জানান যে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে এবং এর জন্য সব সামরিক ইউনিটের যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। পাকিস্তানের উচিত উভয় পক্ষের মধ্যকার প্রাসঙ্গিক চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলা।
এদিকে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে বলেছে, দেশটির এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে নৌবাহিনীর সি স্পার্ক-২০২৬ মহড়া চলার সময় একটি ভারতীয় জাহাজ আগ্রাসী আচরণ করে এবং একটি পাকিস্তানি জাহাজের খুব কাছাকাছি চলে আসে।
বুধবার রাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন এবং ১৯৯১ সালের সামরিক মহড়া, যুদ্ধসংক্রান্ত চলাচল ও সেনা স্থানান্তরের বিষয়ে পূর্ব অবহিতকরণ সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন। পাশাপাশি এটি এ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তার সরকারের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে যে, ভারতীয় পদক্ষেপ পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। একই সঙ্গে ভারতকে আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো, বিশেষ করে সমুদ্রে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধসংক্রান্ত চুক্তিগুলো পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারও একই বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাবেন। এই ঘটনায় পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিশ্বেরও দৃষ্টি আর্কষণ করতে চেয়েছে।
• ১৯৯১ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কী চুক্তি হয়েছিল?
১৯৯১ সালের এপ্রিলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক মহড়া, রণকৌশলগত অনুশীলন এবং সৈন্য চলাচলের বিষয়ে আগাম নোটিশ বা বার্তা প্রদানের নিয়মাবলি নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির উদ্দেশ্য, উভয় দেশের মধ্যে কোনো সামরিক মহড়া বা সৈন্য চলাচলের সময়ে যাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা। এই চুক্তিতে বলা আছে, উভয় দেশের স্থল, বিমান ও নৌবাহিনী একে অপরের কাছাকাছি এলাকায় কোনো সামরিক মহড়া পরিচালনা করতে পারবে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবারের সংঘর্ষকে ওই চুক্তির, যার মোট ১৫টি পৃথক ধারা রয়েছে তার মধ্যে ১০ নম্বর ধারার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে উভয় দেশের নৌ-জাহাজ ও সাবমেরিনগুলোর একে অপরের থেকে অন্তত তিন নটিক্যাল মাইল দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক।
পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনেছে।
• বিশেষজ্ঞদের কী পর্যবেক্ষণ?
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ অলোক বনসলের মতে, ভারতীয় যুদ্ধজাহাজটি যদি কোনো ফ্রন্ট-লাইন বা সম্মুখসারির বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ হতো এবং সেটি যদি পাকিস্তানি বোটটিকে আঘাত করে ডুবিয়ে দিত, তবে তা অহেতুক একটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হতে পারত।
ভারতীয় নৌসেনার অপারেশন ও ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন ডিরেক্টর কমোডোর রঞ্জিত রাই সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন এটি খুবই ইন্টারেস্টিং একটি ঘটনা।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের পিএনএস হুনেন নামের ফ্রিগেটটি ২৩০০ টন ওজনের যুদ্ধ জাহাজ যেটি রোমানিয়ায় নির্মিত। এতে ছোট আকারের ক্ষেপণাস্ত্র ও কামান রয়েছে এবং এটি একটি হেলিকপ্টার বহন করতে সক্ষম। সম্ভবত এটি সি-স্পার্ক ২০২৬ মহড়ায় অংশ নিচ্ছিল।
পাকিস্তানের নৌবাহিনী যখনই সি-স্পার্কের মতো কোনো মহড়া চালায়, তখন ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের প্রতিবেশী বা প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখে এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা বৈদ্যুতিন যুদ্ধের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে। তারা দেখে কোন ধরনের বিমান উড়ছে এবং কী গতিতে চলছে।
তার মতে, যেহেতু ঘটনাটি গোয়াদর উপকূলের কাছে ঘটেছে, তাই সম্ভবত ভারতীয় নৌবাহিনীও তখন সেখানে নজরদারি চালাচ্ছিল। গোয়াদর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং ভারত সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে থাকে। তখনই পাকিস্তানি জাহাজটি ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজের খুব কাছাকাছি এসে থাকতে পারে।
‘‘ভারতীয় যুদ্ধজাহাজটি নিশ্চয়ই একটি ফ্রিগেট ছিল যেমন সুরাত বা নীলগিরি শ্রেণির জাহাজ। বড়সড় সেই জাহাজটি সম্ভবত ওই নৌ-মহড়ায় কী ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করতেই সেখানে গিয়েছিল, বলেন তিনি।
ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক মুখপাত্র ক্যাপ্টেন ডি কে শর্মা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, সমুদ্রে দুটি জাহাজের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে; তা যুদ্ধজাহাজ হোক কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজ। দুটি জাহাজের এভাবে খুব কাছাকাছি চলে আসাটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং এর ফলে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।