আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানুষের হেদায়াতের জন্য কিতাব ও ওহি নাজিল করেছেন। মুসলমানের দায়িত্ব হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া এসব কিতাবের সত্যতা বিশ্বাস করা এবং বিশেষভাবে শেষ নবী মুহাম্মাদের (সা.) ওপর নাজিল হওয়া কোরআনকে আল্লাহর কালাম হিসেবে বিশ্বাস করা। বায়হাকি (রহ.) ইমানের চতুর্থ শাখা হিসেবে এ বিষয়টিকেই উল্লেখ করেছেন। কোরআন ও হাদিসেও কিতাবসমূহের ওপর ইমানকে মুমিনের পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নবীজিকে (সা.) যখন ইমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন: ‘তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ ও তার রাসুলগণের ওপর ইমান আনবে।’ (মুসনাদে আহমদ, ১৯১)
এই সংক্ষিপ্ত হাদিসে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, কিতাব ও রাসুলকে ইমানের মৌলিক উপাদানের মধ্যে রাখা হয়েছে। কারণ আল্লাহর পরিচয় জানার পর মানুষ কীভাবে তার জীবন পরিচালনা করবে, তার নির্দেশনা আসে তার কিতাব ও রাসুলের মাধ্যমে।
ইমাম বায়হাকির (রহ.) মতে কোরআনের ওপর বিশ্বাসের তিনটি মৌলিক দিক রয়েছে:
১. কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করা
মুমিনকে বিশ্বাস করতে হবে, কোরআন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। এটি মুহাম্মাদের (সা.) নিজের রচনা নয়, জিবরাইলেরও (আ.) রচনা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত রুহ (জিবরাইল) তা নিয়ে তোমার অন্তরে অবতরণ করেছেন।’ (সুরা শুআরা, ১৯২–১৯৪) অর্থাৎ কোরআনের উৎস সম্পর্কে মুমিনের বিশ্বাসে কোনো সংশয় থাকার সুযোগ নেই।
২. কোরআনের অলৌকিকতার ওপর বিশ্বাস রাখা
কোরআনের ভাষা, বিন্যাস ও বর্ণনাশৈলী এমন এক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, মানুষ ও জিন একত্রিত হলেও এর অনুরূপ কিছু নিয়ে আসতে পারবে না। তাই কোরআনের প্রতি ইমানের মধ্যে এর এই অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতিও রয়েছে।
৩. কোরআন অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকার ওপর বিশ্বাস রাখা
মুমিন বিশ্বাস করে, নবীজির (সা.) ওপর যে পূর্ণ কোরআন নাজিল হয়েছিল, মুসলমানদের কাছে সংরক্ষিত মুসহাফে সেটিই রয়েছে। এর কোনো অংশ হারিয়ে যায়নি, বিকৃত হয়নি এবং এতে কোনো অক্ষর বাড়ানো বা কমানো হয়নি। আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই এই উপদেশবাণী অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।’ (সুরা হিজর: ৯)
এই তিনটি বিশ্বাসের পর কোরআনের সঙ্গে মুমিনের সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিণতি হলো, কোরআন অনুসরণ করা। কারণ কোনো কিতাবকে আল্লাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করেও যদি তার নির্দেশনা জীবনে গ্রহণ করা না হয়, তাহলে সেই বিশ্বাসের দাবি পূর্ণ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি অবতীর্ণ করেছি। তোমরা এর অনুসরণ করো।’ (সুরা আনআম, ১৫৫)
অর্থাৎ কোরআনের ওপর ইমান মানুষের হাতে শুধু একটি পবিত্র গ্রন্থ তুলে দেয় না; তার সামনে একটি জীবনপথও খুলে দেয়। সে তখন ভালো-মন্দের মানদণ্ড কেবল নিজের পছন্দ, সমাজের প্রচলন কিংবা সাময়িক লাভের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় না। তার কাছে আল্লাহর বাণী হয়ে ওঠে সত্য যাচাইয়ের একটি চূড়ান্ত মানদণ্ড।
এই বিশ্বাস মানুষের ভেতরে একটি বিশেষ দায়িত্ববোধও তৈরি করে। কোরআন যদি সত্যিই আল্লাহর কালাম হয়, তাহলে তা শুধু তেলাওয়াতের জন্য নয়; বোঝার জন্য, চিন্তা করার জন্য এবং অনুসরণ করার জন্য। তাই কিতাবের ওপর ইমানের স্বাভাবিক প্রকাশ হলো কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা তার কথা শোনা, তার অর্থ বোঝা এবং জীবনের সিদ্ধান্তগুলোকে তার নির্দেশনার আলোকে বিচার করা।
কিতাবের ওপর ইমান দিনশেষে একজন মুমিনের কাছে এই প্রশ্ন নিয়ে আসে, ‘আমি কি কোরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করার পর তার নির্দেশনাকে আমার জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছি?’
কিতাবের ওপর ইমান তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন বিশ্বাস কেবল অন্তরে থাকে না; মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও আচরণেও তার ছাপ পড়ে।