পাবনার ঈশ্বরদীতে হঠাৎ করেই বেড়েছে বানরের উৎপাতG এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও ফসলি জমিতে ঢুকে খাবার ও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গাছপালা ও স্থাপনার ক্ষতি করছে বানরের দল। এমনকি রিসোর্টে আগত দর্শনার্থীদেরও বিরক্ত ও আতঙ্কিত করছে তারা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর এলাকার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২ মাস আগে কোনো জঙ্গল বা আশপাশের এলাকা থেকে চার-পাঁচটি বানর জয়নগর এলাকায় আসে। এলাকাটিতে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রিসোর্ট থাকায় সেখানে আসা পর্যটকরা বানরগুলোকে বিভিন্ন খাবার খেতে দিতেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন দোকান থেকেও খাবার চুরি করে নিয়ে যেতে শুরু করে বানরের দল। বর্তমানে তাদের উৎপাত আরও বেড়েছে। প্রতিনিয়ত বসতবাড়ি ও দোকানে ঢুকে খাবারসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে তারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুরুতে চার-পাঁচটি বানরের আনাগোনা দেখা গেলেও বর্তমানে তাদের উৎপাত অনেকটাই বেড়ে গেছে। খাবারের সন্ধানে দলবদ্ধভাবে তারা দোকানপাট, বসতবাড়ি, রান্নাঘর ও রিসোর্টের বিভিন্ন স্থানে ঢুকে পড়ছে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি বাড়িঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও গাছপালারও ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুরুতে বানরগুলোকে খাবার দেওয়ার কারণে মানুষের বসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এখন খাবারের সন্ধানে তারা নিয়মিত লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ফলে বিষয়টি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বানরগুলোর সংখ্যা, অবস্থান ও চলাচলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বানরগুলোকে নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের উৎপাত আর না বাড়ে, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বানরকে কেন্দ্র করে কোনো মানুষ বা প্রাণীর যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ-সংলগ্ন সাদেক খাঁন টি স্টোরের স্বত্বাধিকারী রুবেল খাঁন বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে আমার দোকানে বানর এসে কলা, পাউরুটি, চিপস, কেকসহ বিভিন্ন খাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দোকানদারিতে ব্যস্ত থাকার সময় হঠাৎ করে একাধিক বানর এসে মালামাল নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে চলে যায়। এতে করে আমাকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।’
স্থানীয় স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টেও উৎপাত চালাচ্ছে বানরের দল। খাইরুল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিম তাজওয়ার অহিন বলেন, ‘আমাদের স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টে আগত দর্শনার্থীদের ওপর প্রতিনিয়ত বানরের দল তেড়ে আসে। এ ছাড়া রিসোর্টের ভেতরে থাকা ক্যান্টিনগুলো থেকে চিপস, কেকসহ বিভিন্ন খাবার নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের বিদেশি অতিথিদের কক্ষেও ঢুকে ক্ষতি করছে। এতে রিসোর্টে আগত পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুইমিংপুলে থাকা পর্যটকদের ব্যবহৃত জামাকাপড়ও বানর নিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি রিসোর্টের বিভিন্ন স্থাপনা, বিশেষ করে গাছপালার ক্ষতি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ব।’
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ‘আমার বাড়ির সামনে দোকান ও রিসোর্ট থাকায় বানরের দল প্রায়ই আমার বাড়ির ছাদে এসে অবস্থান করে। সুযোগ বুঝে দোকান থেকে মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। এছাড়া আমার বাগানের বিভিন্ন গাছের কাণ্ড ও ডাল ভেঙে ক্ষতি করছে। কয়েকবার ঘরের ভেতরেও ঢুকে বিভিন্ন খাবার নষ্ট করেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রেবেকা বেগম বলেন, ‘বানরের দল আমার বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে প্রতিনিয়ত খাবার নষ্ট করছে। পাশাপাশি ছোট বাচ্চারা তাদের দেখে ভয় পাচ্ছে ও আতঙ্কিত হচ্ছে। বাড়ির বিভিন্ন ফলগাছের ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই বানর এসে নষ্ট করে ফেলছে।’
আরেক বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘আমার বাড়ির ছাদে প্রতিদিন বানর আসে। রান্নাঘরের টিনের চালের ওপর লাফালাফি করায় চালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে। অনেক সময় বানরগুলো তাদের দিকে তেড়ে আসে। এতে বাচ্চাদের আচড় বা অন্য কোনোভাবে আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী সামাজিক বনায়ন নার্সারি কেন্দ্রের (এসএফপিসি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফশিউল আলম বলেন, ‘আমি আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম ওই এলাকায় কিছু বানর উৎপাত করছে। সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে আমাদের বিভাগীয় অফিস থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেহেতু এরা মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করছে, তাই খুব দ্রুত আমাদের স্টাফ পাঠিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’