ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় পাঁচ দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ‘অলৌকিক উদ্ধারের’ ঘটনা ঘটছে। এখনো জীবিত মানুষ উদ্ধার করা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও উদ্ধারকারীরা এখনো হাল ছাড়েননি। সর্বশেষ ১১ বছর বয়সী দুই শিশুসহ আরও কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যা কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। ভয়াবহ ওই ভূমিকম্পের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে। এখনো নিখোঁজ আছেন হাজারো মানুষ।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৩৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল এগার বছর বয়সী দুটি ছেলে, যাদের রোববার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথকভাবে ধসে পড়া ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়।
সাহায্য সংস্থাগুলোর মতে, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের খোঁজ পাওয়ার আশায় টানা পঞ্চম রাত পার করেছেন।
রোববার পর্যন্ত অন্তত ১৪৫০ জন নিহত হয়েছেন। রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
যদিও উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে, তবুও রোববার উদ্ধারকারীরা আশা ছাড়েননি। তাদের বিশ্বাস, বিশেষ করে যদি আটকে পড়া ব্যক্তিদের কাছে খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকে, তাহলে এখনও জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব।
জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা জানান, বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব, তবে ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’।
প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক মাধ্যমে আশাব্যঞ্জক বার্তা শেয়ার করে চলেছেন। এর মধ্যে সপ্তাহান্তে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানের ভিডিও রয়েছে।
উদ্ধারকারীরা মোইসেস নামে ১১ বছর বয়সী এক ছেলেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জীবিত উদ্ধার করার ভিডিও প্রকাশ করেছেন। উদ্ধার করার সময় তার চোখ সূর্যের তীব্র আলো থেকে রক্ষা করার জন্য ঢেকে রাখা হয়েছিল।
কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট জানিয়েছে, মোইসেস প্রায় ৩ মিটার (৯ দশমিক ৮ ফুট) গভীর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল। উদ্ধারকারী দল শনিবার টানা ছয় ঘণ্টা অত্যন্ত নিখুঁত ও সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধারকাজ চালিয়ে তার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, একটি ওয়াকিটকিতে একজন উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায় যে, ছোট্ট ছেলেটিকে তার বোন ও মায়ের কাছাকাছি অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা দুজনই মারা গেছেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক মাধ্যম এক্সে (আগের টুইটার) একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটিতে কারাবায়েদা শহরে আরও একটি ১১ বছর বয়সী ছেলেকে উদ্ধার করার দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তিনি লিখেছেন, ‘এই সংকটময় সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি জীবনই ভেনেজুয়েলার জন্য আশার প্রতীক।’
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, কারাবায়েদা শহরেই রোববার ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক বাবা ও তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লা গুয়াইরার উপকূলীয় এলাকা কারাবায়েদা অঞ্চল ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কারাবায়েদায় কর্মরত এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী বলেন, এখনও বহু ভবনে তল্লাশি চালানো বাকি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘উদ্ধারকাজের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই। আর খুব সম্ভবত এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন।’
লা গুয়াইরার কাতিয়া লা মার, যা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি, সেখানে মানুষ খালি হাতে ধসে পড়া বহুতল আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজার চেষ্টা করছিলেন।
উইলবার নামের এক ব্যক্তি, যাকে অত্যন্ত ক্লান্ত দেখাচ্ছিলেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তিনি তার আটজন স্বজনকে হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ এখনও তাদের নিজ নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সাহায্য করার পরিবর্তে বরং উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকার রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তার মতে, ‘এর ফলে দুর্গত এলাকায় সাহায্য পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল এখানে আসার বিশেষ অনুমতি পেতে আমাদের সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে আমরা অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি।’
এদিকে একের পর এক আফটারশক উদ্ধারকর্মীদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে এসব কম্পন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
৬৪ বছর বয়সী বাসচালক হেসুস আন্দুয়েসা বলেন, ‘সত্যি বলতে, এতে ভীষণ নার্ভাস লাগে। সামান্য কোনো শব্দ শুনলেই... খুব ভয় লাগে।’
এদিকে মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম খুব ধীরগতির এবং অদক্ষ। কারিবে ও তানাগুয়ারেনা-র মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর কিছু অংশে এখনও ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজই শুরু হয়নি।
হাজার হাজার মানুষ সম্ভাব্য ধসে পড়তে পারে এমন ভবন থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য নিজেদের গাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন অথবা বিমানবন্দর ও গলফ কোর্সের মতো খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন।
কারাবায়েদার গলফ কোর্সটি এখন জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সব কিছু হারিয়ে ফেলা বাসিন্দারা সেখানে দান করা কাপড়ের স্তূপ এবং মানবিক সহায়তার বাক্সগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে নিচ্ছেন।
গলফ কোর্সের আশপাশের এলাকায় কারাবায়েদার রাস্তাগুলো ফেটে গেছে এবং ধ্বংসস্তূপে ঢেকে আছে, ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন ও নীরব। সেই নীরবতা ভাঙছে শুধু ভারী যন্ত্রপাতির গর্জন এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনদের খুঁজে বেড়ানো মানুষের আহাজারি ও তৎপরতায়।
কারিবে এলাকার বাসিন্দা মিলাগ্রোস গনসালেস জানান, তাদের ভবনটি ছিল আশপাশের খুব অল্প কয়েকটি ভবনের একটি, যা ধসে পড়েনি। ভূমিকম্পের পর তিনি যত দ্রুত সম্ভব তার পরিবারকে নিয়ে গলফ কোর্সে আশ্রয় নিতে চলে যান।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার দুই ছোট মেয়ে এবং দুইজন বয়স্ক আত্মীয়কে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় আমরা সবাই জীবিত বের হতে পেরেছি। ভবনটিতে আর বসবাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি- এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
রদ্রিগেজ জানান, লা গুয়াইরার হোসে মারিয়া ভার্গাস ক্রীড়া কমপ্লেক্সকেও একটি জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সেখানে কাপড়, ওষুধ এবং খাদ্যসামগ্রী বাছাই ও বিতরণের কাজ করছেন।
রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমাদের জনগণ এই ভয়াবহ সময় ও কঠিন মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবুও পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে যতটা সম্ভব কার্যকরভাবে সবকিছু পরিচালনা করা হচ্ছে।’
উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করতে গত কয়েক দিনে মেক্সিকো, স্পেন, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য থেকে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক কর্মকর্তা টম ফ্লেচার শনিবার জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩৯টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে ৫০ থেকে ১০০ জন সদস্য রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রায় ২,০০০ উদ্ধারকর্মী এখানে এসে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে ১১১টি প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং চিকিৎসক দলও। আমরা অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র ড্রোন ব্যবহার করছি—যেগুলোকে `তেলাপোকা ড্রোন` বলা হয়। এসব ড্রোন ধসে পড়া ভবনের ভেতরে আটকে থাকা মানুষকে শনাক্ত করতে আমাদের অনেক সাহায্য করছে।’
গত বুধবার রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে। এতে প্রায় আটশ ভবন ধসে পড়ে, যার ফলে বহু মানুষ ভবনের নিচে আটকা পড়ে যান। সূত্র: বিবিসি বাংলা।