আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, খাওয়ার শেষ পাতে মিষ্টি বা ফল খাওয়া নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি নিয়মিত সুন্নত। বিশেষ করে যে কোনো মেজবান বা ভোজসভায় শেষ আইটেম হিসেবে মিষ্টি রাখা যেন এক অবিচ্ছেদ্য রেওয়াজ। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘সুন্নত’ বলতে যা বোঝায়, খাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়া কি সে রকম কোনো সুন্নত?
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সুন্নত হলো এমন কোনো কাজ যা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে নিয়মিত করেছেন এবং করতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে প্রমাণিত রয়েছে। খাওয়ার পর ‘মিষ্টি খাওয়া’ না নবীজির (সা.) নিয়মিত কোনো কাজ আর না কখনও খাওয়ার পর মিষ্টি খেতে উৎসাহ দিয়েছেন।
নবুওয়তি জীবনে অনেক সময়ই নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মতো তিন বেলা কয়েক পদ দিয়ে খাবার খাওয়ার সুযোগ পেতেন না। দিনের পর দিন তার ঘরের চুলায় আগুন জ্বলত না, অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটত। অনেক সময় তার পুরো দিনই কাটতো কিছু খেজুর আর পানি খেয়ে। তাই নিয়মিত খাবারের একটা মূল আইটেম থাকা এবং তা শেষ করে মিষ্টি কিংবা ফলমূল খাওয়ার মতো বিলাসিতা করার কোনো সুযোগই তার ছিল না।
তবে এটা সত্য যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিষ্টিজাতীয় খাবার পছন্দ করতেন। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হালুয়া ও মধু খুব পছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি: ৫৪৩১)
এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ণনায় খাবারের পর খেজুর খাওয়ার ঘটনাও প্রমাণিত আছে। যেমন ইকরাশ ইবনে যুয়াইব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে নিয়ে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে প্রবেশ করেন এবং খাবার আনতে বলেন। প্রথম তিনি গোশত দিয়ে রুটি খান, তারপর খেজুর খান।
সেদিনের ঘটনা বর্ণনায় ইকরাশ (রা.), রাসুল (সা.) খাবার আনতে বললে আমাদের সামনে গোশত ও ঝোলে ভেজানো রুটি (সারিদ) ভর্তি একটি বড় পেয়ালা আনা হলো। আমরা তা থেকে খেতে লাগলাম। এরপর আমাদের সামনে আরেকটি পাত্র আনা হলো, যার মধ্যে বিভিন্ন রকমের কাঁচা-পাকা খেজুর ছিল। আমরা তা খেলাম। এরপর পানি আনা হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত ধুলেন এবং ওজুর বিধান বর্ণনা করলেন। (সুনানে তিরমিজি: ১৮৪৮)
সম্ভবত এ ধরনের হাদিসগুলো থেকেই সমাজে এই ধারণাটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, মূল খাবারের পর মিষ্টি বা ফল খাওয়া একটি সুন্নত; কারণ খেজুর একাধারে যেমন মিষ্টি জাতীয় বস্তু, তেমনি তা একটি ফলও বটে।
কিন্তু এসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে প্রতিবেলার খাওয়ার পর মিষ্টি বা ফল খাওয়াকে ‘সুন্নত’ বলে সাব্যস্ত করা উচিত নয়।
অবশ্য কেউ যদি প্রিয় নবীর পছন্দের কথা স্মরণ করে বা ভালোবেসে খাওয়ার শেষে মিষ্টি বা ফল খেতে চায়, তবে তাকে নিষেধ করা বা অনুৎসাহিত করারও কিছু নেই। এটি জায়েজ ও স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে শরিয়তের পরিভাষায় এই কাজটিকে ‘সুন্নত’ বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।